‘কিত্তনখোলা’ বাঙলা নাটকের নিজস্ব রীতি ও আঙ্গিক প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রয়াস

আয়নাল হক
ভূমিকা :
সেলিম আল দীন বাংলা নাটকের নিজস্ব রীতি ও আঙ্গিকের প্রতিষ্ঠাতা। বিভাগোত্তর ভারতবর্ষে প্রবাহিত সাহিত্যকে কতিপয় সাহিত্যিক স্বতন্ত্রতায় ভাস্বর করার প্রয়াস পেয়েছেন। এক্ষেত্রে স্বতন্ত্রতা আনয়নকারী অনন্য এক ব্যক্তিত্বের নাম সেলিম আল দীন (১৯৪২-২০০৮)। তিনি বাঙালি জাতির নাড়ির সাথে মিশে থাকা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নাট্যসাহিত্যে পরিস্ফুট করেছেন। তাঁর পূর্বে অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপাদানসমূহকে নাটকে সংমিশ্রিত করে প্রাচ্য ও প্রাচাত্যের মেলবন্ধন করতে চেয়েছিলেন। তিনি ইউরোপীয় নাটক আর আমাদের সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোকে একত্র করেছিলেন। অবশ্য তাঁর পূর্বেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেশজ রীতিকে টেনে তুলেছিলেন এবং বৈশ্বিক করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর লেখায় তিনি সফল হয়েছিলেন, যদিও এগুলো তখন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তারপরে দীর্ঘ সময় ইউরোপীয় নাট্যধারায় আমাদের নাটক চর্চা হতে থাকে। এক পর্যায়ে বিদেশি এই ধারা বা রীতিই আমাদের অগ্রগণ্য এবং নিজস্ব হয়ে গেল। বিশেষ করে, রুশ নাট্যব্যক্তিত্ব লেবেদেফ যখন ১৮৭৫ সালে কলকাতায় ‘ডিসগাইস’ নাটকটি মঞ্চস্থ করলেন, তখন যাঁরা মঞ্চ নাটক করার উপযুক্ত মানুষ তাঁরা মনে করলেন এটাই আমাদের আদর্শ। আর সেই মান্যতাই চলে আসছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু সেলিম আল দীন নাট্য সাহিত্যে নিয়ে এলেন ভিন্ন ও নিজস্ব এক ধারা। বাংলার জনপদের প্রান্তিক জনমানসে মিশে থাকা জীবনাচরণ ছিল তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রধান অনুষঙ্গ। তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মে লোকজ ভাবধারাকে অক্ষত রাখতে পরম শান্তির আশ্রয় লাভ করেছেন মধ্যযুগের আখ্যানসমূহের ছায়াতলে। এ প্রসঙ্গে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মন্তব্য স্মর্তব্য: ‘সেলিম অনবরত সন্ধান করে চলেন প্রকাশের এক নতুন মার্গ; নতুন কিন্তু বাংলা ভাষার সৃষ্টি এবং হাজার বছরের ধারাবাহিকতার অন্তর্গত অবশ্যই।’

হাজার বছরের এই ধারাবাহিকতার ভেতরেই সেলিম আল দীনের পরিচয় সফলভাবে নিহিত। ঐতিহ্য ও গৌরবময় অতীতের সঙ্গে সমকালের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও জীবনধারার মিশেল তাঁর নাট্যধারাকে করেছে ঋদ্ধ থেকে ঋদ্ধতর। এই মিশেল রূপায়ণই তাঁর নাট্যকর্মের অন্যতম চলৎ-শক্তি। এ কারণেই তাঁর নাটক রচনার ক্ষেত্রে এসেছে কৌশলগত বৈচিত্র্য আর বিষয়গত নতুনত্ব। এই নতুনত্বের উৎসে ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিচিত্র জীবন; আর তাদের অস্তিত্বে মিশে থাকা সংস্কৃতি।

সেলিম আল দীন নিজেও প্রথম দিকের গতানুগতিক ধারায় নাটক লিখেছিলেন। এরপর নিজের অভ্যস্ত গন্ডিকে ছেড়ে এসে তিনি দৃষ্টি ছড়িয়ে তাকালেন চারদিকে। তিনি পাশ্চাত্য নাট্যরীতির পরিবর্তে বাঙালির নিজস্ব নাট্যকৌশল অবলম্বনে ব্রতী হন। পাশ্চাত্যের প্রভাববিস্তারী বলয় থেকে বেরিয়ে বাঙালি সমাজের নিজস্ব গল্প এবং জীবনঘনিষ্ঠ উপাদান সংগ্রহ করে নাটক রচনা শুরু করেন। এমনই জীবনঘনিষ্ঠ এক নাট্যকর্ম তাঁর ‘কিত্তনখোলা’। পূর্ববর্তী নাটক ‘শকুন্তলা’ থেকে ‘কিত্তনখোলা’য় পদার্পণের মাধ্যমে তিনি এক নতুন নাট্যজগৎ নির্মাণ করেন। ‘কিত্তনখোলা’ রচনার মধ্য দিয়ে সেলিম আল দীন বাংলা-নাট্যশিল্পকে নতুন রূপ দান করেন। মূলত, এ নাটকের মাধ্যমেই পাশ্চাত্য নাট্যরীতি পরিহারপূর্বক প্রাচ্যীয় রীতির প্রবর্তন শুরু হয়। ‘কিত্তনখোলা’ হয়ে ওঠেছে বাঙালির প্রান্তিক জনমানুষের প্রথাগত জীবনে স্থিত সাংস্কৃতিক আচার-আচরণের ইতিবৃত্ত।

‘স্বদেশের গাঁও-গঞ্জ ও তার নানা শ্রেণির মানুষকে একের পর এক রচনায় নিয়ে এলেন। তখনও তো তাদেরকে ঘিরে যে-সত্য ফুটে উঠল, তা খুব সাবলীলভাবেই পৌঁছাতে পারল সকলের কাছে। স্বদেশকে খোঁজার জন্যই তাই সেলিম আল দীন স্বদেশীয় ভাষার দিকে মুখ ঘোরালেন। বিষয় ও লক্ষ্য বদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন হলো নতুন কাঠামো ও প্রকরণের উদ্ভাবন। উদ্ভাবন ঠিক নয়, যা ছিল তাকেই ফিরিয়ে আনা।’ কী ছিল, যাকে ফিরিয়ে আনতে হবে? ইংরেজদের উপনিবেশ পত্তনের আগে বাংলার যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল এবং আজও মুমূর্ষু অবস্থায় হলেও টিকে আছে, সেখানেই তাকে পাওয়া যাবে। আর সেটা হচ্ছে বাংলার মধ্যযুগের সাহিত্য কিংবা লোক-আঙ্গিক। এ একেবারে নতুন কথা তা-ও নয়। বহু একাডেমিক আলোচনায় তার উল্লেখ বহু আগেই হয়েছে। কিন্তু সেলিম আল দীন বা সৈয়দ জামিল আহমেদের আগে এত বিশদভাবে কেউ বলেননি। তবে ‘অনুসন্ধানের যে কাজেই আগে বা সমকালে হোক না কেন, সেলিম আল দীনের অনন্যতা এখানেই যে, তিনি এই গবেষণাকে তাঁর মৌলিক সৃজন কর্মে নিয়ে গেলেন। এবং বাঙালির নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক বলে যে, কিছু হওয়া সম্ভব, তা শুধু কথায় নয়, নিজের রচনার মধ্যে প্রমাণ করলেন।’

ইউরোপীয় নাটক তথা এরিস্টটল প্রবর্তিত যে নাট্যধারা, তাঁকে তিনি অস্বীকার করলেন তাঁর গবেষণায় এবং গবেষণালব্ধ দেশজ উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি করলেন নতুন এক নাট্য অবয়ব। ‘পাশ্চাত্য ধারার বহিরঙ্গ থেকে বেরিয়ে এসে শুধু সঙ্গীত ও বর্ণনা বা আখ্যানের একটা সমন্বয় ঘটালেন, যা বাঙালির শিল্পরূপেরই নিজস্ব গড়নের ঐতিহ্য।’ বাঙালির হাজার বছরের শিল্পরুচির ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা নাট্য আঙ্গিক তাঁর শিল্প প্রকরণ হোক এ ছিল তাঁর প্রাণের দাবি। ফলত বিলুপ্তপ্রায় নাট্যিআঙ্গিকের পুনর্জন্মের জন্য অনুসন্ধান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার বহুস্তর অতিক্রম করতে হয়েছে তাঁকে। ‘জিজ্ঞাসা সংকলনে’ (শিব নারায়ণ রায় সম্পাদিত) প্রকাশিত ‘কিত্তনখোলা ও ঢাকা থিয়েটার’ শীর্ষক ‘পত্ররচনাভঙ্গি’ প্রবন্ধে নাট্যকার সেলিম আল দীন তাঁর নাট্যাদর্শ সম্পর্কে বলেছেন,‘(ক) নাটকের চলতি পরিসরকে ভেঙে (খ) ইউরোপীয় তীব্র ঘটনাবৃত্তের বদলে এ নাটকের কাহিনি ‘মঙ্গল কাব্যে বা গাজীর গানের গল্প-গাঁথুনির সমান্তরাল করে তোলা তাঁর উদ্দেশ্য। নিজ লক্ষ পূরণে তার নিরলস শ্রমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যআঙ্গিক ও বর্ণনাত্মক নাট্যাভিনয় রীতি।’ উল্লিখিত তথ্যের ভিত্তিতে এ কথা বলা যায় ‘সেলিম আল দীন বাঙলা নাটকের ইতিহাস ধারায় নিজস্ব পথ বিনির্মাণ করেই এ পর্যন্ত তাঁর চলা অব্যাহত রেখেছেন।’

বিশ্বনাট্য সাহিত্যে দ্বৈতসত্তার এমন নাট্যকার বিরল। যিনি একাধারে গবেষক ও নাট্যকার। গবেষণা করে সূত্রের আবিষ্কার এবং সেই সূত্রমতে নাটক লেখার পরীক্ষা-নিরীক্ষা তিনি অনবরত করেছেন। একদিকে যেমন নাটকের বিষয়বস্তু নির্ধারণ আবার এর যথাযথ উপস্থাপন- দুটি বিষয়ে তাঁর গবেষণা চলেছে এবং সফলভাবে তা মঞ্চায়ন হয়েছে। তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রথম পর্বের তিনটি নাটক হচ্ছে- কিত্তনখোলা, কেরামত মঙ্গল ও হাতহদাই। এ তিনটি নাটককে অনেকে আঙ্গিকগতভাবে ট্রিলজি বলে থাকেন।

কিত্তনখোলা নাটকের বিষয় ও আঙ্গিক পর্যালোচনা :
‘কিত্তনখোলা’ নাটকের পূর্বের নাটক ‘শকুন্তলা’। এই নাটকটিতে তাঁর নতুন চিন্তার প্রয়োগ লক্ষ করা যায় না। এই নাটকটিতে পাশ্চাত্য ও প্রাচীন ভারতীয় নাট্যরীতির প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। কিন্তু এই সংশ্লেষেও তাঁর সন্তুষ্টি আসেনি। তাঁর লব্ধজ্ঞানের প্রয়োগ দেখা যায় ‘কিত্তনখোলা’ নাটকে। তাঁর ‘কিত্তনখোলা’ নাটকে এতদ্বিষয়ক নিরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রত্যক্ষ করি। ‘কিত্তনখোলা’ সে অর্থে তার নতুন চিন্তার ফসল। এই নাটকে তিনি অঙ্ক বিভাজন ত্যাগ করে সর্গ বিভাজন করেছেন।

‘কিত্তনখোলা’ সামাজিক ও পেশাগত রূপান্তরের নাটক। এ গ্রন্থে নানা রূপান্তরের নায়ক মৃগী রোগে আক্রান্ত সোনাই। সে কিত্তনখোলা মেলায় এসে আমাদের সংস্কৃতির ড়নলবপঃরাব-এর সঙ্গে পরিচিত হয়। অর্থাৎ সমাজ অভ্যন্তরে বিদ্যমান পেশাগত রূপান্তরের বস্তুগত রূপটি সে প্রথমবারের মত প্রত্যক্ষ করে। যাত্রাদলের নায়িকা বনশ্রী বালা, বছির, চালের ব্যবসায়ী গোলাপগাছি প্রত্যেকেই রূপান্তরিত জীবনের মর্মবেদনা বয়ে বেড়াচ্ছে অষ্ট প্রহর। লাউয়া রুস্তমের সঙ্গে ঘটে সোনাইয়ের সর্বশেষ রূপান্তর। লাউয়া সম্প্রদায়ের মেয়ে ডালিমনের চিত্তে রূপান্তরের ঢেউয়ের দোলা। কিন্তু পূর্ব সংস্কার বশে সে পিতৃপুরুষের পেশায় টিকে থাকার ব্যর্থ সংগ্রামে এক ধরনের আত্মবিসর্জন দেয় শেষাবধি। ইদু কন্টাক্টর সামাজিক রূপান্তরের ফসল। অথচ বিত্ত অর্জনের অব্যবহিত পরে শ্রেণিগত স্বভাববশে সে নিজেই এখন সামাজিক রূপান্তর সাধনে তৎপর। অর্থাৎ যে শোষণযন্ত্র সমাজের পেশাগত রূপান্তরকে ত্বরান্বিত ও দ্রুততর করে, ইদু তার চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ।

সোনাই, বছির, রুস্তম, গোলাপগাছি, বনশ্রী, ডালিমন বঞ্চিত ও রূপান্তরিত জীবনের প্রতিচ্ছবি। জীবনের অর্থ খুঁজতে তারা ব্যস্ত। সহস্র বাঁক পরিবর্তন তারা প্রত্যক্ষ করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘জীবন’ আসলে কি তারা তা খুঁজে পায় না। আর এই জীবনের ‘পালাকার’ কে তাও তারা খুঁজে ফেরে। তাদের এই অনুসন্ধান মূলত নাট্যকারেরই অনুসন্ধান। তাই সেলিম আল দীনসামাজিক রূপান্তরকে বিশ্বসৃষ্টি সম্পর্কিত পুরাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করেন অবলীলায়। ফলত ছগীবুড়ির কিস্সা- জ্বীনের রাজায় মানুষের পাথর বানাইত- পাথর থিক্যা গাছ- গাছ থিক্যা ফল- ফল থিক্যা পংখী…. আমার হ্ইে দশা হইছে।

মধ্যযুগের অমর স্রষ্টা মহাকবি আলাওল রচিত ‘পদ্মাবতী’ কাব্যে বর্ণিত ককানুস পাখির বয়ানও এ নাটকে ব্যবহৃত হয়েছে। এর উপজীব্যতাও এই রূপান্তর। চাঁদও রূপান্তরিত হয় কলায়, নদী নিরন্তর সঞ্চরণশীল। তারও আছে জোয়ার-ভাটা- ভাঙা কূল- প্লাবন ও শীর্ণতা। এই তেতো লবণাক্ত জীবনের বাঁকে বাঁকে মানুষের জন্য অপেক্ষা করে রূপান্তর। সামাজিক মানুষের এই রূপান্তরের পালা উপস্থাপিত হয় ‘কিত্তনখোলা’ রূপী মেলায়। অর্থাৎ গোটা সমাজের বিভিন্ন রূপের আশ্রয়ে নাট্যকার এখানে এক নবতর মেলার গোড়াপত্তন করেন। যে মেলায় রঙ বাহারি আনন্দের অমৃতধারার সঙ্গে স্রোতস্বিনী দুঃখের নদী, ক্ষয় আর স্বপ্নভাঙার অন্তহীন প্রবাহ।

এই মেলায় মহাজীবনের কলরোল সার্বক্ষণিক ব্যস্ততার চঞ্চল গতিরেখায় উদ্ভাসিত। আকর্ষণীয় পণ্য ঘিরে সৃষ্টি হয় মানুষের ভিড়। এ মেলায় আনন্দ কুড়াতে আসে আনন্দ কুড়ানিরা, দুঃখ বিক্রয় করে কেউ সুখ কুড়ানের নিমিত্তে। বিচিত্র স্বভাব ও বিচিত্র শ্রেণির মানুষের এই সমাবেশে প্রতিহিংসা চরিতার্থ হয়, সর্বস্ব খোয়ায় কেউবা, কেউবা করে হত্যা-আত্মহত্যা- ইত্যাকার নানান সামাজিক কর্ম-অপকর্ম সংঘটিত হয় মেলায় বহু বর্ণিল সামিয়ানার নিচে হ্যাজাক লন্ঠনের আলোকমালার প্রত্যক্ষতায়।

নাট্য ভাষা:
‘কিত্তনখোলা’ নাটকের মধ্য দিয়েই সেলিম আল দীন তাঁর নিজস্ব নাট্যভাষা তৈরি করলেন। সেভাষা কোনো প্রচলিত ভাষা নয়। পূর্বে তিনি নিজেও বৃত্তাবদ্ধ ছিলেন যে ভাষায়, তাকে তিনি অস্বীকার করলেন। তিনি আরও বড় জীবনের কাছে যাবেন এবং যাবার প্রয়োজনে নাটকের প্রচলিত ফর্ম ভেঙে ফেলবেন, নাটকের ভেতর উপন্যাসকে নিয়ে আসবেন। কারণ উপন্যাসের ব্যাপ্তি বৃহৎ বা বলা চলে মহাকাব্যের সমান। ‘উপন্যাসে গোটা সমাজ চলে আসে, নাটকের ফর্মের ভেতর যার স্থান সংকুলান সহজ নয়। সেলিমের পক্ষে এই আগমনটা অনিবার্য ছিল, কেননা নাটক তাঁর কাছে জীবনের বিকল্প ছিল না ঠিকই, কিন্তু অবশ্যই জীবনের অংশ ছিল এবং বড় একটা সামাজিক জীবনের দিকে তিনি যাচ্ছিলেন। আর সেই জন্যই এই ফর্ম ভেঙে ফেলা এটা অপরিহার্য ছিল ওই জীবনের দিকে যাবার প্রয়োজনেই। প্রচলিতকে ডিঙিয়েই তাঁকে তাই নিজস্ব একটি নাট্যভাষা খুঁজে পেতে হয়েছিল। তাঁর এই নতুন অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল ‘কিত্তনখোলা’ দিয়েই। এ সম্পর্কে সেলিম আল দীন বলেছেন- ‘কিত্তনখোলা’ থেকে আমার ভাবনা ও রচনারীতি খানিকটা হলেও স্বাবলম্বিতার পথ খুঁজে পেয়েছিল- এ কথা বোধকরি আমার পাঠক ও দর্শকরা স্বীকার করবেন। নাটকের মধ্য দিয়ে উপনিবেশীয় কালে নাট্যগড়ন ভাঙবার চেষ্টা করেছি। তিনি একথাও বলেছেন যে, কিত্তনখোলায় গিয়ে ‘প্রাত্যহিকতার কুনো ব্যাঙের অন্ধকার’ থেকে বের হয়ে এসে ‘বাংলার শুভ্র আলোতে’ দাঁড়িয়েছেন। বাংলার আলো-বাতাস-জল-ভুমি ও ভূমিপুত্ররাই তাঁর ভাবনায় ব্যাপৃত ছিল, সেই জন্যই নাট্যচর্চায় তিনি জাতীয় আঙ্গিক বিনির্মাণের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই আঙ্গিক হবে পরজীবী নাট্যচর্চা পরিহারপূর্বক ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যআঙ্গিক গ্রহণ-চর্চা এবং এবং এর বিশ্বব্যাপী প্রসার। তিনি বলেছেন, জাতীয় নাট্য আঙ্গিক হবে, যা আন্তর্জাতিকতা বিমুখ হবে না। তাইতো তাঁর লেখায় যেমন আছে স্থানীয় উপাদান, তেমনি আছে ব্রেখট, ভার্জিল, দান্তে ও গ্রিক সাহিত্য এবং শেক্সপীয়রীয় নাটক পঠন থেকে সঞ্চয় করা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নাট্যমঞ্চ ও অভিনয় নীতি তিনি অধ্যয়ন করেছেন। তবে তিনি অনুকরণ করেননি। বিচিত্র বিশ্ব-বৈভব তাঁকে নবতর সৃষ্টিতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। তেমনিভাবে সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রের দৃশ্যকাব্য ধারণাকেও তিনি পুরোপুরি গ্রহণ করেননি। তিনি বলেছেন,‘দৃশ্য নয়, দর্শন- ঘটনা নয় বর্ণনামুখীন, যে যাত্রা আমাদের চোখের চেয়ে মনকে সজাগ করে, তাই তিনি গ্রহণ করেছেন।’ অর্থাৎ তার পক্ষপাত ছিল যাত্রার প্রতি, যার আঙ্গিক নির্ভার ও সরল। তবে কোনোভাবেই একই পথে তিনি হাঁটেননি। বিচিত্র বৈভবে গড়া বাঙালি সংস্কৃতির অলিগলি আলপথ মাড়িয়ে নতুন নতুন সৃজনে ব্যাপৃত তথা সৃজ্যমান ছিলেন। ‘নতুনের অন্বেষণ করেছেন জীবনভর। আমার মনে হয়, অনবরত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে পরিণত হওয়া একজন ঋদ্ধ মানুষ সেলিম আল দীন। শিল্পের ভেতরে চলাফেরায় তিনি কখনও একই পথ বেছে নেননি। নতুন নতুন পথ, নতুন নতুন মত এবং শিল্পের অনিবার্যতায় পরিবর্তনের নতুন বাঁকগুলোকে নির্মাণ পুননির্মাণ করেছেন।’ ‘এজন্যই তাঁর নাটকের সংলাপ কিংবা বর্ণনা আমাদের স্পর্শের বাইরে থাকে না- টেনে নিয়ে যায় পরিশুদ্ধ এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল বাস্তবতার ভুবনে, সেখানে লৌকিক হয়ে সেলিম আল দীনের সকল নাট্যচরিত্র এই জনপদের মাটি, মানুষ ও ভূগোলের শরীরে।’

নাট্য চরিত্র নির্মাণ:
সেলিম আল দীনের নাটকের চরিত্র নির্মাণ সম্পর্কে আফসার আহমেদ তাঁর অভিজ্ঞতার কথা এরূপে বর্ণনা করেছেন,‘এক কোকিল ডাকা বসন্ত রাতে সেলিম স্যারকে বাসা থেকে নিয়ে আরিচা রোডের বিশ্ববিদ্যালয়ের জয় বাংলা যাত্রী ছাউনিতে আমরা বসেছিলাম। কিছুক্ষণ পরে সেই রাত ছাপিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠলেন সেলিম আল দীন। কারণ কী! আজ রাতে, এখানে আসার একটু আগে তাঁর কিত্তনখোলা নাটকের বনশ্রী বালা আত্মহত্যা করেছে। সেলিম আলদীনের বুকের ভেতরে দলাপাকানো বেদনার প্রকাশ তাঁর এই কান্না।…এভাবেই নাট্যচরিত্র স্রষ্টার সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসা-দ্রোহে অভিভাজ্য হয়ে ওঠেছে। আমরা জানি, নাটকের ভেতর চরিত্রের মৃত্যু ঘটে লেখকের ইচ্ছায়। সাধারণ লেখকের হাতে সেই ইচ্ছা সবসময়ই অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে না। কিন্তু বড় লেখকের হাতেই চরিত্রের মৃত্যু অমোঘ হয়ে ওঠে- লেখকের ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায় নয়, চরিত্রের জীবনগতির অনিবার্যতায়।’
‘…রবীন্দ্রনাথের পরে বর্ণনার ভেতর দিয়ে চরিত্রের ইমেজকে নানা বর্ণলেপনে তিনিই তুলে ধরেছেন বাঙলা নাট্যকর্মে।

লৌজং নদীর ধারে কিত্তনখোলা গ্রামে মনাই বাবা নামে এক পিরের মাজার গড়ে ওঠেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে। সেই সময় থেকে কিত্তনখোলায় প্রতিবছর মাঘমাসের ভরা পূর্ণিমায় তিনদিনের মেলা বসে। এই মেলায় দূর-দূরান্তের বহু মানুষের সমাগম হয়। কেউ মেলায় আসে কেনা-বেচা করতে, কেউ আসে বায়োস্কোপ দেখতে, কেউ আসে ‘নবযুগ’ অপেরার যাত্রা দেখতে। অনেকে জুয়া খেলে, কেউ কেউ এসে তাড়ি খায়, কেউ কবিগান শোনে। এক দিনমজুর সোনাই আসে টুইটাম গ্রাম থেকে, তার বাপ ছিল চাষী। সোনাইয়ের বাপ পাবনা জেলার বাসিন্দা, সে ছিল জোলা অর্থাৎ তাঁতি। নাটকের বড় অংশ জুড়ে সোনাই উপস্থিত, কিন্তু সে নাটকের নিয়ন্ত্রক নয়। এক সময় তার সুখের সংসার ছিল, জমি ছিল, বউ ছিল; এখন তার কিছুই নেই অর্থাৎ হৃতসর্বস্ব। সোনাই মৃগী রোগী; জীবন চালাতে সে ইদু কন্টাক্টরের কাছ থেকে জমি বন্ধক দিয়ে চার হাজার টাকা নিয়েছিল। তার সেই ঋণের টাকা সুদে-আসলে বেড়ে যায়। ফলে ইদু চায় ছলেবলে তার জমির সাফ-কবলা। কিন্তু সোনাই জমি ছাড়তে চায়না; আবার ঋণের টাকা শোধ করতেও অক্ষম। ফলে ইদু কন্টাক্টরের সাথে তার সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

‘কিত্তনখোলা’ নাটকে সোনাই, বছির, ছায়ারঞ্জন, বনশ্রী, ডালিমন নিন্মবর্গের মানুষ। সোনাই ইদু কর্তৃক প্রতারিত। তার প্রতিরূপ বছির, ছায়ারঞ্জন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা কর্র্তৃক প্রতারিত, তার পিতা পাঞ্জাবিদের হাতে খুন হয়, মা ধর্ষিতা হয়ে মারা যায়। সেই থেকে সে যাত্রার আসরে নেচে গেয়ে মদ খেয়ে কষ্ট ভুলতে চায়। জীবন সম্পর্কে তার ছন্নছাড়া ভাবনা, রুজির প্রয়োজনে আজ সে যাত্রাদলের নট, দরকারে সে ধর্ম ত্যাগ করতে চায়-
‘আমি মুসলমান হব।’ পেটের দায়ে মানুষ কি না করতে পারে।

বনশ্রী বালার মধ্যে এক ডোম নারীর জীবন ও শিল্পচেতনার সমন্বিত চিত্র তুলে ধরেছেন নাট্যকার। ডলিমন লাউয়া সম্প্রদায়-ভুক্ত এক নিন্মবর্গীয় মানুষ; যার পেশা ঝাকায় করে মনোহারী দ্রব্য ফেরি করা। এদের স্থায়ী কোনো বসতি নেই। তারা নদীর ঘাটে নৌকায় বসবাস করে। ‘কিত্তনখোলা’ নাটকের শেষ সর্গে লক্ষ করা যায়, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও সম্প্রদায়ের মানুষগুলো জীবন-জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন স্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। স্থান ত্যাগই শুধু করেনি, তারা তাদের পেশা ত্যাগ করতেও বাধ্য হয়েছে নির্দ্বিধায়। তবে এই পরিবর্তনের মধ্যেও ডালিমন অপরিবর্তনীয়। সে তার স্বভূমি ও নিজস্ব জাতিগত পেশা ও ঐতিহ্য ত্যাগ করেনি। জাত্যভিমান ও জাতের সম্মান তার চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রকাশ। রুস্তম যখন তার জাতের নিন্দা করে, তখন সে প্রবল আপত্তি করে এবং রুস্তমকে থামিয়ে দেয় :
ডালিমন : ‘চুপ কর। চুপ কর। জরম ফিরাইতে পার তুমি? ভাল-মন্দ আমাদের পুরব পুরুষের- আমাগো কিসের দুষ।
রুস্তম : সেই পাপ ছাড়ে নাই। পাপ বাপেরেও ছাড়ে না। তা এর এত দরদ কেন?
ডালিমন : আমার জাত। দরদ থাকব না?.. ..
রুস্তম : কর্ম দুষে কষ্ট করে।
ডালিমন : কর্ম দুষ- হ, কর্ম দুষ। পানিতে একবার যে নামে বাঁচনের নিগা- হে নি আর ডাঙ্গায় ঠাঁই পায়, রুস্তম ভাই? আমিও তোমার মত গালপাড়ি জাতেরে, কিন্তু অন্যে গাল দিলে কষ্ট লাগে। কূল পাইলে কেউ পানিতে নামে, না।
ডালিমন তার সম্প্রদায়ের অহং বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসার মানুষ সোনাইয়ের সাথে ডাঙায় ঘর বাঁধতে রাজি হয় না; বরং সে চলে ‘লাউয়ার মাইয়া ডাঙায় কুনদিন ঘর বান্ধে না। বানতে চাইলেও পারে না।’ ২৬
এই লাউয়া সম্প্রদায়েরই রুস্তম নতুন জীবনের সন্ধানে নিজের ঐতিহ্য-অহং বিসর্জন দিয়ে দুখাইপুরে চলে যায়, গ্রহণ করে সাপুড়ে বৃত্তি- সঙ্গে নিয়ে যায় সোনাইকে।
‘কিত্তনখোলা’ নাটকে নাট্যকার রূপান্তরবাদকে প্রয়োগ করে প্রাচীন বাংলার জনজীবনকে সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ সামগ্রিক অর্থে একটি বড় গ্রাম। এই দেশে বসবাস করে যেসব মানুষ, তারা বিভিন্ন ধর্মে, বর্ণে গোত্রে বিভাজিত হলেও তাদের প্রাচীন সমাজ-সংস্কৃতি-সভ্যতা ছিল এক ও অভিন্ন। গ্রামীণ মেলার বিভিন্ন অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ করলে তা স্পষ্ট হয়। কারণ এদেশ অসাম্প্রদায়িক। মনাই বাবার মাজার তার প্রমাণ। এখানে সব ধর্মের মানুষের মিলন মেলা বসে।
অপরদিকে নাট্যকার বর্তমান সময়ের চিত্র তুলে ধরেন- এই অভিন্ন আনন্দ-মেলা এখন ইদু কন্টাক্টরের হাতে জিম্মি, তারাই মেলার কর্ণধার। এই হলো সময়ের সাথে সাথে মানুষের মানসিক রূপান্তর। প্রতিকূলতার মধ্যেও আনন্দ-বিনোদন ধরে রেখে জীবন চালায় এই নিন্মবর্গের মানুষগুলো। ‘শামছল বয়াতির মুখে আমরা পাই মধ্যযুগের সমৃদ্ধিভরা ঐতিহ্যের কিসসা-কাহিনি ও পুঁথি। আমাদের প্রাচীন সম্পদ ‘সয়ফুলমুলুকবদিউজ্জামান, মহুয়ার পালা, রহিম-রূপবান পালা আসরে ব্যক্ত করে প্রমাণ করেন যে, বাংলার অতীত ঐতিহ্য অম্লান। আর এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিন্মবিত্তই লালন করে।’

‘কিত্তনখোলার সোনাই, বনশ্রী, ছায়ারঞ্জন, রবিদাস, সুবল, ইদু কন্টাক্টর- এরা সব চেনা চেনা মানুষ। কিন্তু নাটকের ভেতরে তারাই হয়ে ওঠে বঙ্গীয় জনপদ, অধিবাসী ও সংস্কৃতির অবিভাজ্য অংশীদার। ‘কিত্তনখোলা’র গল্প কাঠামোর ভেতর দিয়ে এভাবে তিনি উন্মোচন করেছেন বাঙালির গল্প, বাঙলার গল্প কীভাবে বিশ্বমানবের গল্প হয়ে ওঠে তারই রহস্যকথা।’

বাঙলা নাট্যরীতি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সেলিম আল দীন এই চেনা-জানা জনপদের জীবন-জীবিকা ও তাদের জীবনদর্শনজাত অনুভূতির প্রকাশ মাধ্যমকেই বিশ্বজনীন করার নবরূপ উদ্ভাবন করেছেন। এ প্রসঙ্গে আফসার আহমদ বলেছেন-
‘আমরা ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যে গায়েনের কাহিনী বর্ণণার মধ্যে দেখি, গায়েন অখন্ড একটি কাহিনিকে পরিবেশনার প্রয়োজনে খন্ড খন্ড করে বর্ণনা করেন। খন্ড বর্ণনাগুলো যুক্ত থাকে সংগীতের মীড়ের মতন কাহিনির শরীরে। তাই খুব সচ্ছন্দে গায়েন গল্পের একটি অংশকে এক জায়গায় রেখে আরেক অংশের বর্ণনা শুরু করেন। গায়েন যখন বলেন, এই কথা এখানে থাক, দেখি রাজকন্যা লালমতি এখন কী করছে তার রাজপুত্র জামালকে গভীর বনে হারিয়ে। এভাবে গায়েন-রীতির গল্প বলার অবিরাম ধারাটিকে খানিক বিরতি ঘটিয়ে দর্শকের কল্পনার স্থানান্তর প্রক্রিয়া ঘটান গায়েন। ফলে খুব সহহজেই এই রীতিতে দর্শক-শ্রোতা-অভিনেতার পারস্পরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে গল্পটি এগিয়ে চলে। সেলিম আল দীনবর্ণনাত্মক বাংলা নাট্যের এই রীতির আধুনিক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন কিত্তনখোলায়।’

‘কিত্তনখোলা’ নাটকের কাঠামো নির্মাণ হয়েছে সর্গ বিভাজনের মধ্য দিয়ে। প্রচলিত অঙ্ক বিভাজনের বদলে মহাকাব্যের সর্গ বিভাজনের আদলে। প্রতিটি সর্গে আছে অসংখ্য খন্ড খন্ড চিত্র সেগুলি এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। সর্গ বিভাজন যখন হলো, তখন নাটকটি মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি পেল। সংস্কৃত নাটকের সংজ্ঞানুসারে এটি হয়ে গেল মহানাটক। ‘সংস্কৃত নাটততত্ত¡ অনুযায়ী সাত অঙ্কের উপরের নাটককে ‘মহানাটক’ বলা হয়। সে অনুযায়ী সেলিম আল দীনের ‘কিত্তনখোলা’ মহানাটক। কিন্তু সর্গ বিভাজন ও বিষয়বস্তুও ব্যাপকতায় প্রকৃতপক্ষে ‘কিত্তনখোলা’ এপিক ড্রামা বা মহাকাব্যিক নাটক। এখানে মহাকাব্যিক বাস্তবতার যথাযথ প্রয়োগ ঘটেছে। গল্পের রূপান্তর ঘটেছে, চরিত্রসমূহের পেশারও রূপান্তর ঘটেছে। ওভিদের মেটামরফোসিস কাব্যের পৌরাণিক রূপান্তর এবং বৌদ্ধজাতকের ধর্মীয় রূপান্তরে ‘কিত্তনখোলা’ সামাজিক রূপান্তরের মহাকাব্য হয়ে ওঠেছে। এখানে চাষি বেদে হয়, বেদে চাষি হয়, গাছকাটার শ্রমিক কৃষক, আবার কৃষক গ্রহণ করে লাউয়া বেদের জীবন। এমন ইত্যাকার রূপান্তরে ‘কিত্তনখোলা’ সামাজিক রূপান্তরের মহাকাব্য হয়ে ওঠেছে। আর এর মূলে রয়েছে বাংলা আখ্যান কাব্যের বর্ণনাধর্মিতার আধুনিক বুনন কৌশল।

‘‘কিত্তনখোলা’ নাটকের ভাষা কাব্যধর্মী ও ইঙ্গিতবাহী অসংখ্য চিত্রকল্পের সমষ্টি। যতটা না সংলাপে প্রকাশিত, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রকাশিত হয় দর্শকের বোধ ও কল্পনায়। সেলিম আল দীন এ নাটকে আঞ্চলিক ভাষার একটি নতুন অবয়ব নির্মাণ করেছেন। এ কথা ঠিক যে, সেলিম আল দীন বাংলা ক্রিয়াপদ নিয়ে অনবরত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।’’ ‘কিত্তনখোলা’ নাটকের ভাষা তাই কবিতার মত অন্তর্লীন। সংলাপের প্রথাগত বন্ধনে তাঁর নাট্যচরিত্ররা আবদ্ধ থাকে না। সংলাপ থেকে সংলাপে যে নাট্য দৃশ্য নির্মিত হয়েছে, ‘কিত্তনখোলা’ নাটকে তার কৌশলটি বাংলা নাটকের গীতিধর্মিতা এবং কাব্যিক ব্যঞ্জনার মধ্যে নিহিত।

বাংলা নাট্য কৌশল অবলম্বন করে সেলিম আল দীন এই নাটকে ‘নাট্যোৎকণ্ঠা’ বা ক্লাইমেক্সের ইউরোপীয় ধারণাকে বর্জন করেছেন। সোনাই ইদু কন্টাক্টরকে হত্যা করে পালিয়ে যাবার সময় রুস্তম দুখাইপুরের পথের বর্ণনা দিতে থাকে। হত্যা এবং হত্যার বীভৎসতা মঞ্চে দেখানোও হয় না এবং দর্শক তথ্য পায় কিন্তু তাকে হত্যার বীভৎসতায় আটকে না রেখে অন্যদিকে অন্য ঘটনায় নিয়ে যাওয়া হয়। এটি বাংলা নাট্যের কৌশল। এতে ক্লাইমেক্স তৈরি হয়, আবার ভেঙে যায়। এভাবে বর্ণনা ও সংগীত প্রয়োগে ইউরোপীয় ক্লাইমেক্সের সাজানো ফর্ম থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে ক্লাইমেক্স তৈরি করে এবং বর্ণনার মধ্যে নাট্য কাহিনী এগিয়ে চলে।

সেলিম আল দীনের ‘কিত্তনখোলা’ নাটকে লক্ষ করা যায়, তিনি কোনো একটি চরিত্র বা ব্যক্তির উৎকণ্ঠা তৈরি করেননি বরং সমগ্র জনপদের আনন্দ বেদনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘ফলে তাঁর নাটকে ইউরোপীয় অনুসৃত নাটকের কাঠামো ভেঙে গেছে এবং পাশ্চাত্য নাটকের সুতীব্র ঘটনাবৃত্তের বদলে এ নাটকে মঙ্গলকাব্য কিংবা অন্যান্য কাহিনি কাব্যের চিরায়ত বর্ণনাত্মক রীতিটি নতুন আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আর তাই বিষয়-বিন্যাসের ধরন অনুযায়ী অঙ্ক বিভাজনের পরিবর্তে সর্গ বিভাজনের প্রক্রিয়াটি তিনি গ্রহণ করেছেন। নয়টি সর্গে বিভাজিত এই নাটকে বহু উপকাহিনী, লোকজ প্রবাদ, লোক সংস্কৃতি এবং দেশের অজস্র উপাখ্যানের সমাহারে গঠিত বিষয়বস্তুর বিশালতা, অজস্র মানব চরিত্ররে সমাবেশ, জীবনের বিঘ্নসংকুল গিরিখাতে এ সকল মানুষের অবিরাম অনবরত পথপরিক্রমা এবং এই চলমানতায় তাদের পেছনে না তাকানো- নাটকের দৃশ্য বিভাজনের নতুন প্রক্রিয়ার সঙ্গে অঙ্গীভূতহয়ে নাটকটিতে মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি এনে দিয়েছে। খন্ড খন্ড অঙ্ক বিভাজনে যা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।’

সেলিম আল দীন শুধু নাটক থেকে অঙ্ক বিভাজনই বর্জন করেন নি, তিনি ইউরোপীয় সংলাপ নির্ভর কাহিনি বর্ণণার রীতিকেও বর্জন করেছেন। ‘তাঁর মতে নাটক উপন্যাস কবিতা গল্প এবং সঙ্গীত পরস্পরের অঙ্গে অদ্বৈত শিল্পতীর্থের অভিযাত্রায়। সেলিম আল দীন বিশ্বনাটকের ইতিহাসে এই ধারণা প্রথম উপস্থাপন করলেন যে, নাটকের আসলে কোনো বিভাজন নেই। কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞার নিয়মে শিল্পকে দেখা ঠিক না। যার জন্য নাটক উপন্যাস কবিতা গল্প এমনকি চিত্রকলা পর্যন্ত সেলিম আল দীনের শিল্পভুবনে অভেদাত্মক হয়ে ওঠে।তিনি নতুন এই শিল্পভাবনার নাম দিলেন ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’। এই নামটি তিনি গ্রহণ করলেন শ্রী চৈতন্যের ধর্মদর্শন থেকে, যে ধর্মদর্শনের অবয়বে মানবিকতার কিরণচ্ছটা।’ এই ধর্মদর্শনের মূল কথা হলো-স্রষ্টা ও সৃষ্টির একীভ‚ত হওয়া। এই দুয়ের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। তাদের অভেদাত্মক রূপটিই হলো দ্বৈতাদ্বৈত।

‘‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ কথাটি শিল্প পরিভাষারূপে সেলিম আল দীন প্রথম প্রয়োগ করেন। এই শিল্পতত্ত্বে একের মধ্যে বহু এবং বহুর মধ্যে এক হবার দৃষ্টান্তরূপে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য থেকে প্রভূত দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা যায়। ধরা যাক- পাঁচালি, এ একই সঙ্গে নাট্য, নৃত্য, গীত, কৃত্য, কাহিনি, উপাখ্যান, রাগরাগিনীর বিচিত্র সঞ্চয়- তার এক দেহে যেন নিখিলের সমস্ত বৈচিত্র্য এক অবিভাজ্য স্বর্ণ সংকেতে জ্বলজ্বল করে।’’

সেলিম আল দীন দেশের মাটি ও মানুষের জন্য নাটক লিখেছেন, কিন্তু তাঁর দেশ ভাবনা ছিল বিশ্বভূগোলের আলোকে। দেশীয় ঐতিহ্যকে যিনি বিশ্ব আলোকে আলোকিত করতে চেয়েছেন দেশজ রীতিতে, তাঁর শিল্পভাবনা বা দর্শন পাশ্চাত্যের অনুকরণে হতে পারে না, তা হয়ও নি অত্যন্ত সচেতনতায়। প্রাচ্য দর্শনেই তিনি পরিপূর্ণ জীবন খুঁজে পেয়েছেন। তাই তিনি প্রাচ্য শিল্পতত্ত¡ দিয়ে পাশ্চাত্য শিল্পের অপূর্ণাঙ্গতাকে তুলে ধরেছেন। তাই তাঁর নাটকে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের সমান্তরাল অথচ স্বতন্ত্র এক শিল্পের দেখা মেলে।

সেলিম আল দীন শিল্পের জন্য শিল্প রচনা করেননি, দায় থেকে লেখেছেন। তাই নাটককে তিনি দায়বদ্ধতার শিল্প বলেই বিবেচনা করেছেন। মানুষের জন্য তাঁর নাটক আর এই মানুষ তাঁর সময় ও দেশের নয় বরং সমগ্র বিশ্ব মানুষ ও সর্বকালের সর্বস্থানের মানুষ।

কৃতজ্ঞতা:
গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা
থিয়েটার ওয়ালা, দশম বর্ষ, ৩- ৪ যুগ্ম সংখ্যা, জুলাই-ডিসেম্বর-২০০৮, সম্পাদক – শাহরিয়ার হাসান।
আফসার আহমেদ, সেলিম আল দীন স্মারক বক্তৃতা জাতীয় নাট্যশালা, গ্রাম থিয়েটার, মে-জুলাই-২০১৫,
দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পের পূর্বাপর, সেলিম আল দীন,
সেলিম আল দীন রচনা সমগ্র

(সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা ইমপিরিয়াল কলেজ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *