নাট্যসন্ত রামেন্দু মজুমদার

[০৯ আগস্ট ২০১১- দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় নাট্যসন্ত রামেন্দু মজুমদার নিয়ে নাসির উদ্দীন ইউসুফ এর প্রবন্ধটি পাঠকদের জন্য গ্রাম থিয়েটার ওয়েব পোর্টালে পুণঃপ্রকাশ করা হলো।]

নাসির উদ্দীন ইউসুফ |
২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ, ৭ আগস্ট ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ রবীন্দ্র মহাপ্রয়াণের শোকে নিমজ্জিত সমগ্র বাংলাদেশ। মেঘনা নদীর কোলে লক্ষ্মীপুর জনপদ এই শোকপ্রবাহে নিমজ্জিত। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে দিন যায় শোকে-কান্নায়, দিন আসে আনন্দ-আশায়। ২৪ শ্রাবণ ১৩৪৮ কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের দুই দিন পর শ্রাবণের মেঘবৃষ্টির অলিন্দ গলিয়ে মোহনীয় চাঁদ ওঠে আকাশে। মেঘ ঝরে যাওয়া গভীর আকাশে একাদশীর চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় জেগে ওঠে কুর্মপীঠ, লক্ষ্মীপুর চরের গঞ্জ-গ্রাম-জনপদ। সেই সোনাঝরা রাতে লক্ষ্মীপুরের বর্ধিষ্ণু মজুমদার পরিবারে হারিকেনের অনুজ্জ্বল আলোয় জন্ম নেয় এক উজ্জ্বল বর্ণের শিশু। দ্বিতল বাড়ির ফাঁকফোকর গলিয়ে উজ্জ্বল চাঁদের আলোর বিপরীতে কান্তিমান নবজাতকের দিকে তাকিয়ে আনন্দ-জোয়ারে ভেসে যান জননী-জনক আর ভাইবোনেরা। নাম রাখেন রামেন্দু। অর্থ দাঁড়ায় মোহনীয় চাঁদ। কিন্তু কে জানত, বাঙালির প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া সেই শিশু রামেন্দু কৃষ্ণ মজুমদার একদিন বিশ্বমঞ্চ আলোকিত করবে তার কর্মস্পৃহা আর তৎপরতায়! লক্ষ্মীপুরের মোহনীয় চাঁদ এখন বিশ্বমঞ্চের দিকনির্দেশক।

লক্ষ্মীপুরের নির্মল পরিবেশে মাতৃস্নেহে আর পিতার মানবপ্রেমের দীক্ষায় রামেন্দু মজুমদারের পথযাত্রা। আজ ১৪১৮ বঙ্গাব্দ, ৭০টি শ্রাবণ পেরোনো দীর্ঘ পথযাত্রায় কত মানুষকে প্রেম-মমতায় রামেন্দু মজুমদার বেঁধেছেন অথবা বাঁধা পড়েছেন, তার হিসাব মেলানো কঠিন।

ধলপ্রহরে মায়ের কণ্ঠ থেকে নির্গত সুমধুর সংগীত আর এস্রাজের নিখুঁত বাদন যাঁর জীবনের প্রথম শিল্পপাঠ, সুপারিগাছের তৈরি মঞ্চে হ্যাজাকের হলুদ আলোয় ‘টিপু সুলতান’রূপী পিতার অভিনয়ে মুগ্ধতা যাঁর প্রথম মঞ্চপাঠ, সিরাজদৌল্লা নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে যাঁর প্রথম মঞ্চযাত্রা, সেই কিশোর ভাবী জীবনে দেশপ্রেম, মানবসেবা আর শিল্পের অধরা ভুবনে অনমনীয় এক প্রাজ্ঞ পুরুষ হিসেবে জীবন উৎসর্গ করবেন, এটাই নির্ধারিত সত্য।

কিন্তু এই সত্য স্তরে উপনীত হতে তাঁকে ত্যাগ করতে হয়েছে জীবনের লঘু আনন্দ আর লোভের হাতছানি। এ বড় কঠিন কাজ। তিনি কঠিনেরে ভালোবাসিলেন। কেননা, কৈশোরে তাঁর মানস গঠন হয়ে যায় সিরাজউদ্দৌলা আর টিপু সুলতানের দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠায়, মাতার কণ্ঠ আর এস্রাজের ধ্বনির বিমূর্ত আহ্বানে। সেই আহ্বান মুক্তির। সেই মুক্তি শিল্পের কঠিন অগ্নিদাহ, চক্রব্যূহ অতিক্রমণে সিদ্ধ।

রামেন্দুদা, তুমি জ্বরাগ্রস্ত মানুষের পাশে, প্লাবিত জনপদ নিঃসহ মানুষের মধ্যে, দুর্ঘটনাকবলিত মানুষের শিয়রে দাঁড়িয়েছ পরম মমতায়, নিজস্ব যা কিছু সঞ্চয়, সব উজাড় করে। আমাদের নিয়ে গেছ মানুষের দ্বারে দ্বারে।

অধিকারহীন মানুষের হূত-অধিকার পুনরুদ্ধারে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্রের মুক্তির মিছিলে তুমি নির্ভীক যোদ্ধার দৃঢ়তায় নেতৃত্ব দিয়েছ।

ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের সৃষ্টি নরকের আগুনে পুড়ছে যখন স্বদেশ, দেশত্যাগী মানুষের মিছিল যখন পশ্চিমমুখী, তখন তুমি হিমালয়ের মতো অনড়, অবিচল। নিজ বাসভূমে আপন অধিকারের শক্তিতে, বিশ্বাসে তুমি স্থিত। চৌষট্টির দাঙ্গাপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো শেখ মুজিবের জীবন বাজি রাখা লড়াইয়ের স্মৃতি এখনো তোমাকে শক্তি জোগায়, সাহস দেয়। এভাবে জীবনের সহস্র বাঁকে জয়-পরাজয় জীবন-মৃত্যুর অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ মানুষ তুমি। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র সীমার ঊর্ধ্বে তোমার অবস্থান।

মানুষের লড়াই-সংগ্রাম, ভালোবাসা-প্রেম, সামগ্রিক জীবন শেষাবধি শিল্পে এসে আশ্রয় নেয়, পূর্ণতা পায়। এ সত্য শৈশবেই পিতামাতা এবং শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক তোমার সত্তায় প্রোথিত করে দিয়েছিলেন। তুমি সেই পথেই আজীবন হেঁটেছ। জীবনকে নিয়ে গেছ শিল্পের কাছে আর শিল্পকে নিয়ে গেছ জীবনের গভীরে। নাটক হয়ে গেল তোমার জীবনের আরেক নাম।

বাংলা নাটকের অপ্রতিরোধ্য নাট্যদল ‘থিয়েটার’ তোমারই হাতে সৃষ্ট এক নবপ্রাণ। কিন্তু গোষ্ঠীবৃত্ত ভেঙে তুমি নিজ কাঁধে তুলে নিলে বাংলাদেশের সব নাট্যদলের ঐক্যের গুরুদায়িত্ব। সেই ঐক্যের শক্তি—যে নাট্যজোয়ার সৃষ্টি করল, তাতে প্লাবিত হলো বিশাল বাংলা। বাংলা নাট্যজোয়ারের কথা জানান দিতে স্বপ্রণোদিত তুমি ছুটে গেছ বিশ্বনাট্যসভায়। তোমার সাংগঠনিক দক্ষতায় বিশ্বনাট্যসভার মানুষ জানল যে বাংলাদেশ শুধু ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, দরিদ্র আর রাজনৈতিক গুপ্তহত্যার দেশ নয়, শত মানুষের শত নাট্যজনের বিচিত্র বিষয়ের নাট্যনৃত্য আর সংগীতের মূর্ছনায় দ্যুতিময় হয়ে ওঠে এ দেশের প্রতিটি সন্ধ্যা। তার পরের ঘটনা তো ইতিহাস।

বাংলাদেশের মেঘনা নদীর পার থেকে দূরপ্রাচ্যের জাপান সাগর, সুদূর পশ্চিমের ক্যারিবিয়ান সাগর, প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত অথবা আটলান্টিক মহাসুমদ্র—পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তে রানারের মতো ছুটে বেরিয়ে বাংলা নাটকের সংবাদ পৌঁছে দিল যে জন, সে আর কেউ নয়, সে আমাদের প্রিয় রামেন্দু মজুমদার।

ক্লান্তিহীন এই রানারকে অতঃপর বিশ্বনাট্যসভার সভাপতির সুউচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করলেন বিশ্বনাটকের প্রতিনিধিত্বকারী মানুষেরা। বাংলাদেশের নাট্য কপালে রাজতিলক এঁকে দিলে তুমি রামেন্দু মজুমদার। তোমাকে অভিনন্দন।

আজ তোমার ৭০ বছর পূর্ণ হলো। মহাকালের হিসাবে এ কোনো সংখ্যা নয়। কিন্তু মানুষের আয়ুর হিসাবে এ এক পূর্ণ জীবন। সেই জীবন তুমি করেছ কর্মমুখর। ক্লান্তিহীন তুমি হেঁটেছ শিল্পের বন্ধুর পথ। পরিশ্রান্ত নও তুমি এখনো। হতাশও নও। কিন্তু স্বস্তিতে আছো কি? না। নেই। কেননা, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাট্যের দ্বন্দ্ব বা লড়াই সভ্যতার সমান বয়সী। রাষ্ট্র অনিবার্য কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে। আর নাটকও অনিবার্য কিন্তু সে চায় মানুষের মুক্তি নিরন্তর। রাষ্ট্রের প্রয়োজন শৃঙ্খল, নাটকের প্রয়োজন শৃঙ্খলভাঙার গান। এ এক বিরামহীন যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধক্ষেত্রে তুমি আমাদের প্রাজ্ঞ যুধিষ্ঠির। তুমি মহাভারতের যুধিষ্ঠিরের মতো কষ্টসহিষ্ণু, স্থির বুদ্ধিসম্পন্ন, অসীম ধৈর্যশীল বিশাল পুরুষ।

তুমি এসেছিলে বলে বাংলা নাট্য বঙ্গীয় বদ্বীপ অতিক্রম করে বিশ্বনাট্য ভূগোলে তার মানচিত্র স্থাপনে সক্ষম হয়েছে। তুমি তোমার অসীম ধৈর্য আর কর্মশক্তির ব্যবহারে অসাধ্য সাধন করেছ। সুকঠিন কাজকে সহজ করেছ। কেননা, তোমার বিশ্বাস তো কবিগুরুর সেই অমর পঙিক্ত—‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম। সে কখনো করে না বঞ্চনা।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *