স্মরণ
রেজাউল করিম লেবু
“শেকড়ে স্বদেশ, আগামীতে আমাদের” কিংবা “নাটক আমার বিশ্ব ভূগোল”— এই অমোঘ শ্লোগান দুটি শুধু বাক্য ছিল না, ছিল এক দার্শনিক নাট্যচিন্তার প্রতিফলন। যার মূলে ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক, আমাদের প্রিয় ড. আফসার আহমদ।
করোনা অতিমারির নিস্তব্ধ সময় পেরিয়ে ২০২১ সালে, সামান্য শিথিলতার সুযোগে মাদারগঞ্জের চারণ থিয়েটার আয়োজন করেছিল চারদিনব্যাপী নাট্যোৎসব। প্রথম দিন আমাদের মাঝে ছিলেন ড. আফসার আহমদ, দ্বিতীয় দিনে এলেন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু ভাই। মেলান্দহে অবস্থান করেই তাঁরা অংশ নিলেন উৎসবের উচ্ছ্বাসে।
মনে আছে, ৫ মার্চ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে আমরা আফসার ভাইকে বিদায় জানাচ্ছিলাম। আসাদুল্লাহ ফারাজীর বাসায় সকলে একসঙ্গে নাস্তা করে বের হলেন তিনি। আমাদের মন চাইছিল না তাকে ছাড়তে, তবু যেতে হবে। অগত্যা কিছু ফটোসেশন, তারপর মুখভরা সেই চিরচেনা হাসি নিয়ে গাড়িতে উঠলেন। বিদায়ী হাত নাড়ার আড়ালে যেন একটুখানি বিষাদ মিশে ছিল— আজও মনে হয়, হয়তো তিনি নিজেই টের পেয়েছিলেন সেটিই হবে আমাদের সঙ্গে শেষ দেখা। কয়েক মাস পর তাঁর চলে যাওয়ার সংবাদ যখন এলো, তখনই মনে পড়ল সেই হাসির আড়ালের নিঃশব্দ বেদনা।
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের মহাপ্রয়াণের পর যাঁরা তাঁর সৃষ্টিকে গবেষণা ও নাট্যচর্চায় এগিয়ে নিয়েছিলেন, আফসার ভাই ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু শিক্ষকই ছিলেন না— ছিলেন লেখক, দার্শনিক, কবি, নাট্যকার, গীতিকার, সুরকার ও নির্দেশক। তাঁর সঙ্গে শহিদ সমর থিয়েটার এবং মেলান্দহ গ্রাম থিয়েটারের ছিল আত্মার টান। প্রায়ই বলতেন— “মেলান্দহের ডাকে আমি ‘না’ করতে পারি না।” সেই ডাক পেলে ছুটে আসতেন, কখনো একা, কখনো সস্ত্রীক।
একবারের নাট্যোৎসবে দুই-তিন হাজার দর্শকের সামনে তিনি প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে বক্তব্য রাখলেন। আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের গ্রাম থিয়েটার আন্দোলন নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল এক দার্শনিক আলোকবর্তিকার মতো। পিনপতন নীরবতায় সবাই শুনেছিল। এবারের চারণ থিয়েটারের উৎসবেও এলাকার মানুষ তাঁকে অবারিত শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন।
২০১৭ সালে শহীদ সমর থিয়েটারের উৎসবে তিনি দিয়েছিলেন প্রতিপাদ্য— “শেকড়ে স্বদেশ, আগামীতে আমাদের।” আর ২০১৮ সালে— “নাটক আমার বিশ্ব ভূগোল।” প্রতিটি উৎসবেই তিনি এই শ্লোগানগুলোর ব্যাখ্যা দিতেন, ভেঙে দিতেন পুরোনো গণ্ডি, দেখাতেন বাঙালির হাজার বছরের শেকড়ের সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের ৪০ বছর পূর্তি এবং শহীদ সমর থিয়েটারের ৪০ বছর উদযাপন উপলক্ষে চারদিনব্যাপী মহোৎসব শেষ হলো। আফসার ভাই যদি বেঁচে থাকতেন, নিশ্চিতভাবেই চারদিনই সস্ত্রীক উপস্থিত থাকতেন। তাঁর অনুপস্থিতি তাই শুধু চোখে নয়, হৃদয়েও ধরা দিয়েছে।
প্রিয় আফসার ভাই, আপনার চলে যাওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। যেমন হয়নি সেলিম আল দীনের ক্ষেত্রে। তবে বিশ্বাস করি— যেখানে আছেন, সেখানেও নাটকের জয়ধ্বনি তুলছেন।
আমরা আছি, নাট্যকর্মীরা আছি।
নাটকের জয় হোক।
গ্রাম থিয়েটার দীর্ঘজীবী হোক।
