গাজির রহমান
‘১৫ এপ্রিল, ১৯৫০’— তারিখ, মাস, সাল— এই তিনটি সংখ্যা কেবল একটি জন্মের হিসাব নয়; এ যেন এক আলোকবর্তিকার প্রজ্জ্বলনের দিন। এই দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু—যিনি আমাদের কাছে শুধু একজন ব্যক্তি নন, বরং এক জীবন্ত ইতিহাস, এক সাংস্কৃতিক দীপ্তির অনির্বাণ শিখা।
তিনি ছিলেন না কেবল মঞ্চের আলোয় দীপ্ত একজন শিল্পী; তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক সাহসী সৈনিক। ১৯৭১-এর উত্তাল সময়, যখন একটি জাতি তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে নিমগ্ন, তখন তিনিও সেই মহাযজ্ঞে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। তাঁর চেতনায় ছিল অটল বিশ্বাস—স্বাধীনতা মানে শুধু ভূখণ্ডের মুক্তি নয়, এটি মানুষের আত্মমর্যাদা, সংস্কৃতি ও চিন্তার স্বাধীনতার পরম অধিকার।
এই বিশ্বাসের ভিতর থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন এক দৃপ্ত উচ্চারণ—তিনি নাট্যজন, তিনি নাট্য পিতা, তিনি চলচ্চিত্রকার। এই শব্দগুলো নিছক বিশেষণ নয়; এগুলো তাঁর জীবনসাধনার স্বাক্ষর। তিনি মঞ্চকে করেছেন মানুষের কণ্ঠস্বর, নিপীড়িতের ভাষা, আর সমাজচেতনার এক জাগ্রত অঙ্গন।
তাঁর শিল্পীসত্তার এক অনন্য শিখর আমরা প্রত্যক্ষ করি তাঁর চলচ্চিত্র একাত্তরের যীশু-তে। এই চলচ্চিত্রে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখেননি; তিনি একে রূপ দিয়েছেন আত্মত্যাগের মহাকাব্যে। এখানে এক সাধারণ মানুষ যন্ত্রণার আগুনে পুড়ে হয়ে ওঠে এক প্রতীক—এক যীশুস্বরূপ আত্মদানকারী সত্তা। যুদ্ধ এখানে কেবল রণক্ষেত্রের গর্জন নয়; এটি মানুষের অন্তর্লীন বেদনা, বিশ্বাস ও ত্যাগের গভীরতম উচ্চারণ।
“একাত্তরের যীশু” আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার প্রতিটি ইঞ্চি মাটির নিচে লুকিয়ে আছে অসংখ্য নামহীন মানুষের রক্ত, অগণিত অশ্রু, আর অনির্বচনীয় আত্মত্যাগ। আর সেই ইতিহাসকে তিনি এমন শিল্পময়তায় তুলে ধরেছেন, যা দর্শকের হৃদয়কে স্পর্শ করে, বিবেককে নাড়িয়ে দেয়।
আজ, ১৫ এপ্রিল ১৯৫০-কে স্মরণ করতে গিয়ে মনে হয়—এটি কেবল একটি জন্মদিন নয়; এটি এক চেতনার জন্ম, এক দর্শনের উন্মেষ, এক মানবিক আলোর অবিচল যাত্রা।
নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু—এই নামটি তাই আজ আর কেবল একটি নাম নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতির এক অনিবার্য উচ্চারণ, আমাদের গর্ব, আমাদের প্রেরণা।
শুভ জন্মদিন, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু।
আপনি বেঁচে থাকুন আমাদের ইতিহাসে, আমাদের শিল্পে, আমাদের প্রতিটি মানবিক উচ্চারণে—চির অম্লান, চির প্রাসঙ্গিক।
