Skip to content

Bangladesh Graam Theatre

Home » ঐতিহ্যবাহী নাট্যের নবরূপ বাঙলা মূকাভিনয়

ঐতিহ্যবাহী নাট্যের নবরূপ বাঙলা মূকাভিনয়

রিজোয়ান রাজন
বাঙলা মূকাভিনয়ের হাজার বছরের কোন ঐতিহ্য নাই। নেই কোন ধারাবাহিক চর্চার ইতিহাস। ইতিহাস খুঁজেও পাওয়া যায় না কোন মহান শিল্পীর নাম। অথচ খৃষ্টপূর্ব চারশত বছর পূর্বেই ইউরোপের গ্রিস দেশে মূকাভিনয়ের জন্মকথা শোনা যায়। আর বাংলাদেশে মাত্র বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে স্বাধীনতার অল্প কিছু দিনের মধ্যে মূকাভিনয় হাটি হাটি পা পা করে চলতে শুরু করেছে।

এই সময়ের তিনজন মূকাভিনয়শিল্পী পার্থপ্রতিম মজুমদার, কাজী মশহুরুল হুদা এবং জিল্লুর রহমান জন যারা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক ভাবে বাংলাদেশের মূকাভিনয়ের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন। অবশ্য স্বাধীনতা পূর্ব সময়ের মূকাভিনয়ের কথাও শোনা যায়। সে আলোচনা ভিন্ন। তবে উল্লেখিত তিন জনের মূকাভিনয় পরিবেশনা পাশ্চাত্য ভাব ধারায় প্রতিষ্ঠিত হলেও জিল্লুর রহমান জনের মূকাভিনয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, গল্প নির্বাচন ও পোশাক-পরিচ্ছদে দেশজ ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়।

এদিকে বাঙলা নাটকের ইতিহাস মধ্যযুগের। বাঙলা নাটক ছকে বাঁধা অঙ্ক বিভাজিত বদ্ধ ঘরে পরিবেশিত কোন প্রদর্শকলা নয়। বরং হাটে মাঠে ঘাটে কিংবা বাড়ির উঠানে কুপির আলোয় রাতব্যাপী নানা ফর্মে নৃত্য-গান-সংলাপ-বর্ণনায় সমৃদ্ধ নাট্য যা একান্তভাবে মাটি থেকে উৎসারিত সহজিয়া ঢঙে পরিবেশনা হয় যেখানে ভরতের ব্যাকরণ বা মেথড এ্যাকটিংয়ের কোন বালাই নাই। আছে শুধু শেকড় অনুসন্ধানের তীব্র বাসনা। এ শিক্ষণ পদ্ধতি একান্তই গুরু-শিষ্য পরম্পরা।

বাঙলা মূকাভিনয় একবিংশ শতাব্দীর শিল্প ভাবনা। মূকাভিনয়ের প্রচলিত ধারার সমান্তরালে বর্ণনাত্মক রীতির নাট্যধারা অনুসরণে অথবা গল্পে, আবহে, পোশাকে পঞ্চানো হাজার বর্গমাইলের জল-মাটি-হাওয়ার আখ্যানকে আতস্থ করে দৃশ্য-চিত্র-কাব্যের মাধ্যমে নাট্য উপস্থাপনকে বাঙলা মূকাভিনয় হিসাবে অভিহিত করা যায়। কাজী মশহুরুল হুদা প্রতিষ্ঠিত বাঙলা মূকাভিনয় গবেষণা কেন্দ্র ২০২২ সাল থেকে বাঙলা মূকাভিনয় ধারণা নিয়ে কাজ করছে। দেশব্যাপী কর্মশালা ও উৎসব হয়েছে বাঙলা মূকাভিনয় ধারণা নিয়ে। জাতীয় নাট্যশালায় বাঙলা মূকাভিনয়ের মডেল “বাঙলার রূপ” প্রদর্শিত হয়েছে ২০২৩ সালে। একই ধারণা নিয়ে আরও আগে থেকে ঢাকার নাট্যদল স্বপ্নদল মূকনাট্য পরিবেশন করেছে। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের প্যান্টোমাইম মুভমেন্টও এই ধারায় যুক্ত হয়ে বাঙলা মূকাভিনয় ধারণাটিকে বেগমান করেছে।

বাঙলা মূকাভিনয়ের প্রভাবে মূকাভিনয়ের ট্রেডমার্ক কালো আঁটোসাটো পোশাকের পরিবর্তে লুঙ্গি, গামছ, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, ধ্যুতিসহ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে পোশাাক পরিচ্ছদের নানামুখী ব্যবহার হচ্ছে। হোয়াইট ফেইসের পরিবর্তে সাধারণ মেকআপের অভ্যস্ততা বাড়ছে। পশ্চিমা ধারার মূকাভিনয় দেশীয় আবহে চর্চার পরিবেশ তৈরী হয়েছে। জাত গেলো বলে একসময় যারা সোচ্চার ছিলেন তারা তুলনামূলক ভাবে এখন অনেক সহনশীল হয়েছেন। বর্তমান সময়ের মূকাভিনয় চর্চাকে ট্রানজিশন পিরিয়ড হিসাবে উল্লেখ করতে চাই। একটা নতুন পথের দিশা পেতে যাচ্ছে মূকাভিনয়শিল্প। ভুল ত্রুটির মধ্য দিয়ে মূকাভিনয় চর্চা এগিয়ে যাবে। প্রচলিত ধারার চর্চা এবং বাঙলা মূকাভিনয় চর্চাকে অনেকে পৃথক করতে পারছেন না। কেউ কেউ দুটোকে এক করে ফেলছেন বা জগাখিচুরি টাইপ কিছু একটা করছেন। সময়ের সাথে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে। চর্চার বিস্তৃতি বাড়লে এবং নিয়মিত চর্চিত হল বাঙলা মূকাভিনয় আরও মননশীল হয়ে উঠবে।


শিল্প চর্চায় জাতীয়তাবাদের পাঠ জরুরী। দেশের মানুষের রুচি, অভ্যাস, আচার-আচরণ, সংস্কার, ধর্ম বিশ্বাস, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট, জলবায়ু, মাটিকে বুঝতে হবে৷ এই বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে সার্বজনীন বোধ তৈরী হলে মূকাভিনয়শিল্পটি একটি নির্দিষ্ট ভুখন্ড ও তার জনগণের প্রতিচ্ছবি হবে এবং ক্রমেই তা আন্তর্জাতিক হয়ে উঠবে। এখানেই শিল্পের স্বার্থকতা। বাঙলা মূকাভিনয় সে লক্ষ্যেই অগ্রসরমান। আর কাজটি বাঙলা নাট্যে যুগপথ ভাবে করেছেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন এবং তাঁর শিল্পসঙ্গী বাঙলা নাটকের সুবর্ণপুত্র নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। বাঙলা মূকাভিনয় এই বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে অপরাপর শিল্প মাধ্যমগুলোর নিবিড় সাহচার্য প্রত্যাশা করে। নাটকের মতই সমান গুরুত্বের সাথে মূকাভিনয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নিকট ভবিষ্যতে ঐতিহ্যবাহী নাট্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পমাধ্যম হিসাবে বাঙলা মূকাভিনয় প্রতিষ্ঠা পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *