Skip to content

Bangladesh Graam Theatre

দেশ এবং জীবন গড়তে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা থিয়েটার

আফজাল হোসেন
এই ছবিটা একাত্তর সনের। সামনে যাকে দেখা যাচ্ছে, তিনি অসীম সাহসী একজন গেরিলা কমান্ডার। দেশের বহু মানুষের কাছে তিনি অতি সম্মানীয়। তিনি সম্মানীয় যুদ্ধকালে এবং পরবর্ত্তী অর্ধশত বছরেরও বেশী সময় ধরে দেশের সামাজিক, সাংষ্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর অসাধারণ অবদানের জন‍্য।

যারা তাঁকে দূর এবং কাছে থেকে চেনেন জানেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন, এই মানুষটা অত‍্যন্ত সমাজ সচেতন, মেধাবী ও বিস্ময়কর রকমের সৃজনশীল।

যুদ্ধের শেষে তিনি ভেবেছিলেন, বড় একটা যুদ্ধ এখনো বাকি রয়ে গেছে। সদ‍্য স্বাধীন হওয়া দেশটাকে সুন্দর করে গড়ে তোলার জন‍্য যেমন মানুষের দরকার, তিনি তেমন হৃদয় তৈরির অক্লান্ত চেষ্টায় নেমে পড়েন।

সে মানুষ গঠনের চেষ্টায়, বহু মানুষ রক্ষাও পায়। তাঁর অসাধারণ ভূমিকার জন‍্য আমরা, যারা তাঁর গুনমুগ্ধ এবং অনুসারী সকলেই পরিস্কারভাবে বুঝতে পারি, তিনি একটা প্রজন্মের ভিতর সাংস্কৃতিক চেতনা জাগিয়ে তুলতে পেরেছিলেন বলে জাতির সামনের ভয়ানক বিপদ কিছুটা প্রশমিত হয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশজুড়ে তারুণ‍্যের মধ‍্যে দেখা দেয় ভয়ানক রকমের অস্থিরতা। সে অস্থিরতা একজন মানুষ ও সংগঠকের পক্ষে যতটুকু ঠেকানো সম্ভব, তাঁর ভাবনা, ক্রিয়া, জ্ঞান, দর্শন, সাংস্কৃতিক সচেতনতা ও আন্তরিকতা দিয়ে তিনি ঠেকিয়েছেন বলে মনে করি।

দেশ এবং জীবন গড়তে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা থিয়েটার। তাঁর দর্শন ও বিশ্বাস, থিয়েটারের গভীরতা, আধুনিকতা দিয়ে মানুষ আলোকিত হবে। নিজের মনে আলো জমাতে পারলে, সেইসব মানুষের গুনগত মান দিয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল হবে, এই দৃঢ় বিশ্বাসে তিনি জীবনের প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাস থিয়েটারে নিবেদন করেন।

অতি আবেগে এমন কথা বলা হচ্ছে না। সত্তুর দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমরা যারা বিভিন্ন দলের নামে থিয়েটার করা শুরু করেছি, তারা প্রত‍্যেকেই দেশ, সংস্কৃতি ভালোবাসা মানুষ। যারা অর্থ বিত্ত, প্রতিপত্তি ইত‍্যাদির ধার না ধেরে, কোনো বিশেষ প্রাপ্তির আশা না করে থিয়েটারে, সংষ্কৃতির চর্চা ও অনুশীলনে মন প্রাণ ঢেলে দিয়েছি। কোনো দল, কর্মীরা তার ব‍্যতিক্রম ছিল না।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটার সর্বত্র ক্ষোভ, হতাশা, অন্তর্জ্বালায় ভুল পথে হাঁটার প্রবণতা বেড়েই চলছিল। তাঁর স্বপ্ন, বোধ, নেতৃত্ব আমাদেরকে এমন এক পথে নিয়ে আসে, যে পথ আমাদের রক্ষা করেছে এবং একই সাথে বিরাট এক জনগোষ্ঠীকে নাটকের প্রতি উৎসাহী করে তাঁদেরকেও দিকভ্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন।

তরুণকালে কোনো লোভ, কিছুর মোহে না পড়ে, পূর্ণমাত্রায় নাট‍্যচর্চায় নিবেদিত থাকা কারো জন‍্য খুব সহজ ছিল না। যখন বটবৃক্ষের মতো কোনো মানুষের ছায়া মেলে, সকল অপ্রয়োজনীয় টান থেকে সেই ছায়াই নিরাপদ রাখতে পারে।

সেই বৃক্ষ এতটাই অনুপ্রাণীত করতে পারে, তখন আমরা বিশ্বাস করেছি, অনুভব করেছি, নিজেরা গড়ে উঠছি একইসাথে নাটকের মধ‍্য দিয়ে সাধারণ মানুষকেও গড়ে তোলা হচ্ছে। আমাদের মিলিত চর্চা সকল শ্রেণী পেশার মানুষের আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। ভেবেছি, এমন জীবনই গৌরবময়। সকলের মনে প্রতিজ্ঞা জাগে, এ জীবন থেকে এক চুলও সরবো না।

পৃথিবী একটা কিন্তু সে পৃথিবীর মানুষ বিচিত্র রকমের হয়। দেশের একদল মানুষ হয়তো আমাদেরকে “নাটক করা” মানুষ বলে ভাবেন, আর একদল বিশ্বাসী রয়েছেন, যারা বিশ্বাস করেন, এঁরা সংস্কৃতি সচেতন, সুস্থ চিন্তার, দেশ ভালোবাসা মানুষ।

ঢাকা থিয়েটারেও আমরা একেকজন ছিলাম একেকরকমের কিন্তু থিয়েটারের প্রতি, দেশ ও সংস্কৃতির প্রতি যতটুকু নিবেদিতপ্রাণ হওয়া সম্ভব, সকলের মধ‍্যেই ছিল সে আন্তরিক চেষ্টার স্পষ্ট প্রতিফলন।

আমরা কারা, নামগুলো বললে বোঝা সম্ভব হবে, দীর্ঘ সময় ধরে দেশ, মানুষ ও সংস্কৃতির জন‍্য এ মানুষগুলোর ভূমিকা কেমন ছিল।

সেলিম আল দীন, আল মনসুর, রাইসুল ইসলাম আসাদ, হূমায়ূন ফরীদি, সূবর্ণা মোস্তফা, জহিরুদ্দিন পিয়ার, শিমুল ইউসুফ, লীনু বিল্লাহ, ফারাহ খান মজলিস, জামিল আহমেদ, নায়লা আজাদ নূপুর, পীযূষ বন্দোপাধ‍্যায়, রোজী সিদ্দিকী, শহীদুজ্জামান সেলিম, কামাল বায়েজিদ, ফারুক আহমেদ আরো অসংখ‍্য নাম। সবাই সুন্দর এক বাংলাদেশের স্বপ্নে একটি নাম হয়ে উঠি- ঢাকা থিয়েটার।

সবাইকে একসাথে, একত্রিত করে, ঢাকা থিয়েটার আর সে দলের কান্ডারি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ। যিনি আমাদের সকলের বাচ্চু ভাই।

সত্তুর দশকে একটা প্রতিষ্ঠান ও একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে অনুরক্ত হয়ে আমরা পঞ্চাশ/ ষাটজন তরুণ একত্রে একটি বিশ্বাস, শক্তি হয়ে উঠি। নাট‍্যচর্চার মাধ‍্যমে এই দেশ একদিন পৃথিবীর মানচিত্রে আলাদা অস্তিত্ব, অবস্থান তৈরি করে নেবেই এমন দৃঢ বিশ্বাস ও ভালোবাসায় আমাদের গৌরবময় জীবন ছিল বহমান।

এই দেশটায় রাজনীতি ও সংস্কৃতি অনেককাল ধরে পরস্পরের ছিল। এই মেলবন্ধনের কারণে জাতি পিছনের কালে অনেক সংকট দৃঢতার সাথে মোকাবিলা করতে পেরেছে। যত দিন গেছে, রাজনীতি হতে চেয়েছে কর্তৃত্বপরায়ন। এই দুটো পক্ষ কেউ কারো মতো নয়, বরং অনেক সময় স্পষ্ট হয়েছে, দুজন দুজনের বিপরীত।

যদি পিছন ফিরে তাকানো যায়, প্রমান মিলবে রাজনীতি বিভেদ সৃষ্টি করে নিজ আয়তনের বৃদ্ধি ঘটাতে চায়। সংস্কৃতি চায়, সকল মানুষকে নিয়ে এগিয়ে যেতে।

রাজনীতিতে কোনো পক্ষের মনে যখন একক শক্তি হয়ে ওঠার বাসনা জাগে, এই মানুষ ভাগ করে ফেলার প্রবণতা হু হু করে জেগে ওঠে। তখন ভূমিকা হয়, মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়া করিয়ে দেয়া। নিজ নিজ মত অনুযায়ী এক ভাগকে নির্বাচিত করা হয় ভালো হিসাবে, অপরভাগ চলে যায় মন্দের কাতারে। হঠাৎ ক্ষোভের ধাক্কায়, একচোখা ভালো মন্দের বিচার যেভাবে করা হয়ে থাকে, তাতে দেশের ভালোর চেয়ে ক্ষতিটাই হয় বেশি।

টাটকা প্রমান নিকটেই আছে। গৌরবময় ও বিস্ময়কর জুলাই আন্দোলনের পর এই গণহারে ভাগাভাগির প্রবণতা আবার দৃশ‍্যমান হয়। চোখ কপালে তুলে দেখা হয়েছে এক পলকে মানুষ বিচার করে ফেলা। তুমি ভালো আর তুমি মন্দ- হয়েছে এইরকম যুক্তি, বিশ্লেষণ ছাড়া মনের ইচ্ছায় বিচার।

শেষ বিচারের দিনে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও এরকম চটজলদি বিচার করবেন না।

দূর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, সংস্কৃতি জগতের একজন পুরোধা ব‍্যক্তিত্ব, চিরকাল দেশাত্ববোধে দীপ্ত নাসির উদ্দিন ইউসুফ, অসংখ‍্য মানুষের প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় বাচ্চু ভাই এই চটজলদি বিচারের ভাগাভাগিতে মন্দের দলে পড়েছেন।

আমার দেখা অসাধারণ একজন মানুষ, বাচ্চু ভাই। যে অসাধারণত্ব অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা। মুক্তিযুদ্ধের গৌরব বয়ে বেড়ানো, সংস্কৃতি ও নাট‍্যভাবনা নিয়ে সদা স্বপ্নে উদ্দীপ্ত থাকা মানুষ একজন।

যে মানুষটাকে আমি কখনো ক্লান্ত, ধ্বস্ত হতে দেখিনি। তাঁকে দেখেছি, দেশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে অহরহই ছুটে বেড়াচ্ছেন। সে লক্ষ‍্যেই ছুটে বেড়ানো, যেনো মুক্তিযুদ্ধের আলো, দেশের জন‍্য গৌরব নাটক, সংস্কৃতি চর্চার মাধ‍্যমে সকল মনে গৌরব হয়ে ঝলমল করে।

ছুটে বেড়ানো মানুষটা দীর্ঘ সময় ধরে ঘরবন্দী। পথে হাঁটা মানুষকে ঘরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ‍্য করা হলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। বাচ্চু ভাই, সোজা শক্ত ভাইটা এখন দূর্বল, খুঁড়িয়ে হাঁটেন। হয়তো প্রায়ই তাঁকে রাতের বেলায় নির্ঘুম থাকতে হয়। হয়তো অন্ধকার কখনো কখনো ঠাট্টা করে- দেশের জন‍্য যুদ্ধ করেছিলি, ভালোবেসেছিলি দেশ, এই নে তার প্রাপ‍্য।

বাচ্চু ভাই হয়তো ঠাট্টা করা রাত্রিকে বলেন, তোমার আয়ূ সামান‍্যই। মানুষের জন্ম স্বপ্ন দেখা আর লড়াই করার জন‍্য। আমি খুঁড়িয়ে হাঁটছি তাতে কি? কারো স্বপ্ন খুঁড়িয়ে হাঁটে না, আর যারা দেশের জন‍্য যুদ্ধ করেছে, তারা কেউই মরার আগে মরে যায় না।
আফজাল হোসেন এর ফেসবুকে লেখা একটি পোস্ট গ্রাম থিয়েটারের ওয়েবসাইটে পুনঃপ্রকাশ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *